আপনারা কি হোটেল ‘স্নো ভিউ’ তে? প্রশ্ন শুনে ঝিনুক ঘুরে তাকাল। বয়স্ক দম্পতি আর সঙ্গে সম্ভবত তাঁদের মেয়ে, তারই বয়েসি। "হ্যাঁ, আপনারা তো আমাদের পাশের হোটেলেই আছেন!" হাসিমুখে উত্তর দেয় ঝিনুক। "হ্যাঁ,” সংক্ষেপে উত্তর ঝিনুকের বয়েসি মেয়েটির। আলাপ জমে উঠল অচিরেই। উত্তর কলকাতার বাসিন্দা। মেয়েটার নাম শ্রেয়া, বাবা মাকে নিয়ে পেলিং ঘুরতে আসা দ্বিতীয় বারের জন্য। ঝিনুক এসেছে অভির সঙ্গে; বিয়ে আর তার পরবর্তী সব নিয়মকানুন শেষ করে মধুচন্দ্রিমায়। কাল বিকালে এসে পৌঁছানোতে আশে পাশে ঘুরতে পারেনি। আজ তাই সকালেই বের হয়েছে দুজনে। আগামীকাল ঠিক হয়েছে সাইট সিন করতে বের হবে। হোটেলেই বলা আছে গাড়ি ঠিক করে দিতে। পথে আলাপ বাঙালি পরিবারের সঙ্গে। ওনারা দেখেছেন কালকেই ওদের হোটেলে ঢুকতে। কী যেন একটা বলবে করেও বলতেপারছে না মনে হল ঝিনুকের। পথে অভি আর ঝিনুক দুজনেই ছবি তুলছে। ছেদ পড়ল অভির মায়ের ফোনে। ঝিনুক একটু এগিয়ে গেছে শ্রেয়ার সঙ্গে কথা বলতে বলতে। শ্রেয়া ইতস্ততঃ করতে করতে বলেই ফেলল,"তোমাদের রুম নং কত?" "৪৪,” একটু অবাক হয়েই উত্তর দিল ঝিনুক। এত অস্বস্তি কিসের মেয়েটার? " “ও বাবা! চুয়াল্লিশ! কাল রাতে কিছু ফিল করনি তোমরা?" ঝিনুক কিছুই বুঝতে পারছে না। কেন? কী অনুভব করবে? এদিক ওদিক দেখে শ্রেয়া বলল "মা-বাবা না করেছে কিছু বলতে,ভয় পেতে পার। কিন্তু সাবধান করা উচিত মনে হল আমার।" "কী ব্যাপারে?" ঝিনুকেরও এখন কৌতূহল চরমে। "ওই হোটেলে ৪৩ নং রুমটা নাকি হন্টেড। রুমটা লক করা কিন্তু আশপাশের ঘরেও নাকি যারা থেকেছে তারাও নানা সময়ে অনেক কিছু টের পেয়েছে। গত বারে আমার এক দিদি তোমাদের মত ওই ৪৪ নং রুমেই উঠেছিল। সাংঘাতিক অভিজ্ঞতা হয়েছিল।" কী সেটা আর শোনা হল না, অভির মায়ের সঙ্গে কথা বলা শেষ। ওদের দিকে অভিকে আসতে দেখে চুপ করে গেল শ্রেয়া। বাকি সময়টুকু ঝিনুক চুপচাপ পাহাড়, প্রকৃতি দেখে গেল কিন্তু বুঝতে পারছে তাল-লয় আর ঠিক আগের মত নেই। হোটেলে ফিরে বড্ড অস্বস্তি হচ্ছে ঝিনুকের। মনে হচ্ছে কেউ আড়াল থেকে ওর গতিবিধি লক্ষ্য করছে। এমনি পাহাড়ি এলাকায় রাত নামে তাড়াতাড়ি। তার ওপর ভয়ে আজ আরো আগে অভিকে নিয়ে ডিনার শেষ করে ফেলল ঝিনুক। ওহ্! কতক্ষণে রাতটা পার হবে!! "তুমি জানতে আমাদের পাশের ঘর ভূতুড়ে?" রাতে শোয়ার আগে আদুরে মুহূর্তে এমন প্রশ্ন শুনে অভি ঘাবড়ে গেল। ‘এই রে... এটা জেনেই তো আসা;' অফিস কলিগ সুজিতের কাছ থেকে শুনে এই হোটেল বুক করা। এমনিতেই অভি অ্যাডভেঞ্চারপ্রেমী কিন্তু ঘুণাক্ষরেও ঝিনুককে বলেনি, বড্ড ভীরু স্বভাবের বলে। বেঁকে বসত জানলে। নিশ্চয়ই ঘুরতে গিয়ে আলাপ হওয়া ওই মেয়েটির কাছ থেকে কিছু শুনেছে। উফফ্ যা বকছিল দুজনে! ঝিনুক সবটা বুঝতে পেরে রাগ দেখিয়ে শুয়ে পড়ল। অগত্যা অভিও পাশের সোফায় কম্বল নিয়ে শুল। ঝিনুকের হাত পা ছড়িয়ে শোয়ার অভ্যাস। হোটেলের বেডের সঙ্গে কি আর বাড়ির পালঙ্কের মত খাটের তুলনা চলে? তাও কাল একসঙ্গেই শুয়েছিল কিন্তু মাঝরাতে পাশ ফিরতে গিয়ে ঝিনুক পপাত ধরণীতলে। নতুন বউ এমনি খেপে আছে তার ওপর দুদিন খাট থেকে পড়লে রক্ষা নেই। মাঝরাতে ঝিনুকের ঘুমটা ভেঙ্গে গেল। কেমন যেন গোঁ গোঁ শব্দ। উঠে বসতেই টের পেল ঘরের তাপমাত্রা খুব কমে গেছে। আচ্ছা, টুপ টুপ করে জল পড়া র আওয়াজ হচ্ছে না বাথরুমে?? ঝিনুকের গলা জিভ শুকনো। অভিকে ঠেলা মারতে গিয়েই টের পেল পাশের জায়গা খালি। চমকে গেল ঝিনুক। ভীষণ পাতলা ঘুম ঝিনুকের। অভি পাশ থেকে কখন উঠে গেল আর ও টেরই পেল না। হঠাৎ খেয়াল করল ঘরের এক কোণে রাখা সোফায় কালো কুন্ডলী করা কী যেন। "হে ভগবান!! কী করব এখন!" উঠে দরজা খুলে পালানোর মত শক্তিও যেন হারিয়েছে। মনে পড়ল ছোটবেলায় মা বলত বিপদে মধূসুদনকে ডাকলে তিনি রক্ষা করেন। ভয়ে তাই করতে শুরু করল ঝিনুক। মুখ দিয়ে সেটা গোঁ গোঁ শব্দের ধ্বনি হতে লাগল। চোখ চেপে বন্ধ করে ঝিনুক মাথা দুলিয়ে ঝাঁকুনি দিয়ে শুধু মনে মনে "মধূসুদন" ডাকতে থাকল। হঠাৎ কাঁধে হাত। ঝিনুক এবার চিৎকার করতে গেল। কিন্তু কোন স্বর বের হল না। ফোঁপাতে লাগল- গলা দিয়ে শুধু বেরোল "মধু", গলায় আটকে গেল "সুদন।” "কী হয়েছে ঝিনুক, এমন করছ কেন?" অভির গলা শুনে ঝিনুক সম্বিত ফিরে পেল। "তুমি ছিলে কই?"আঁকড়ে ধরল ঝিনুক অভিকে। "আরে আমি তো সোফায় শুয়েছিলাম।"ও হ্যাঁ,তাই তো। ভয়ের চোটে ভুলেই গেছিল সেটা। তার মানে যে আওয়াজ শুনে ঘুম ভেঙ্গেছিল সেটা অভির নাক ডাকার শব্দ ছিল। শীতে আপাদমস্তক ঢেকে শোয়ার অভ্যাস অভির। তাই শব্দটি এমন ভৌতিক শোনাচ্ছিল। উফ্ফ সাংঘাতিক ভয় পেয়েছিল আজ। কিন্তু একটা ব্যাপার মাথায় ঘুরছিল অভির। থাকতে না পেরে বলেই ফেলল, "আচ্ছা তুমি ' মধু মধু ' করে বিড় বিড় করে কি বলছিলে!!"